কে বড় কাফের ও অধিক পথভ্রষ্ট ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী নাকি মুশরিক?
প্রশ্নঃ আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপনকারী এবং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী (যে ধর্মকে দুনিয়া থেকে পৃথক করার চেষ্টায় রত আছে), তাদের মাঝে কে বড় কাফের ও অধিক পথভ্রষ্ট? শিরক ও শিরকের চর্চা এবং ধর্মনিরপেক্ষতা ও মানুষদেরকে ধর্মনিরপেক্ষতার দিকে আহবান করার মাঝে কোনটি বড় অন্যায়?
উত্তরঃ
الحمدُ للهِ والصلاةُ والسلامُ على رسولِ الله.
হামদ ও সালামের পর কথা হল:-
একজন ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তি সন্দেহাতীতভাবে একজন মুশরিক ব্যক্তির চেয়ে অধিক নিকৃষ্ট কাফের। ধর্মনিরপেক্ষতা শিরকের তুলনায় অধিক ঘৃন্যতর অপরাধ৷
এর অনেকগুলো কারণ রয়েছে এবং এগুলো সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত৷ নিম্নে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হল:-
প্রথম কারণঃ
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ. বলেছেন, “মুমিনরা যেভাবে ঈমানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্তরের হয়ে থাকে, তেমনিভাবে কাফেররাও তাদের কুফুরীর ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্তরের হয়ে থাকে৷ আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন-
إِنَّمَا النَّسِيءُ زِيَادَةٌ فِي الْكُفْرِ … ﴿التوبة: ٣٧﴾
“এই মাস পিছিয়ে দেয়ার কাজ কেবল কুফুরীর মাত্রা বৃদ্ধি করে৷” (সূরা তাওবাহ: ৩৭)
(আল ফাতাওয়া: ১/১০৯)
একদল আলেমদের মতে, ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসীদের মধ্যে যারা পরিচয়গতভাবে হলেও ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত থাকে, তারা মুরতাদদের মধ্যে গণ্য হবে৷ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ. ‘সকল কুফুরীর সমতা’কে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, “এটা সবাই জানে যে, কাফের তাতারীরা তাদের (ধর্মনিরপেক্ষ ইয়াসিক ধর্মানুসারীদের) থেকে উত্তম৷ কেননা তারা নিকৃষ্ট পর্যায়ের ইরতিদাদের মাধ্যমে ইসলাম থেকে ফিরে গেছে৷ আর আসলী কাফেরদের তুলনায় মুরতাদরা বিভিন্ন দিক দিয়ে নিকৃষ্ট৷” (মাজমুউল ফাতাওয়া: ২/১৯৩)
কুফুরীর বিভিন্ন প্রকারের মধ্যকার ভিন্নতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি পরকালকে অস্বীকার করে, কিন্তু এ পৃথিবীর নশ্বরতাকে স্বীকার করে, আল্লাহ তা’আলা তাকে অবশ্যই কাফের সাব্যস্ত করবেন। কিন্তু যে ব্যক্তি পরকালকে অস্বীকার করার পাশাপাশি এ পৃথিবীকে অবিনশ্বর মনে করবে, আল্লাহ তা’আলার নিকট সে সবচাইতে বড় কাফের বলে সাব্যস্ত হবে৷” (মাজমুউল ফাতাওয়া: ১৭/২৯১)
সুতরাং যে ব্যক্তি দুনিয়ার সাথে দ্বীনের সম্পৃক্ততা ও দুনিয়ায় দ্বীনের কর্তৃত্বকে অস্বীকার করবে; সে ঐ ব্যক্তির তুলনায় অধিক নিকৃষ্ট, যে আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করলেও দুনিয়ার উপর দ্বীনের কর্তৃত্বকে স্বীকার করে৷
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ. এ সিদ্ধান্তেও উপনীত হয়েছেন যে, আল্লাহ তা’আলার পরিচয় লাভ, ইবাদাত ও স্মরণ থেকে বিমুখতা প্রদর্শন করে আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করাটা ইবলীস কর্তৃক আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণের চেয়েও মারাত্মক৷ কারণ ইবলীস আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করলেও আল্লাহকে স্বীকার করে৷ দেখুন– (মাজমুউল ফাতাওয়া: ৫/৩৫৬)
ইবলীস দ্বীন ও দুনিয়ার উপর আল্লাহর কর্তৃত্বকে অস্বীকার করেনি বা তা প্রত্যাখ্যানও করেনি৷ সে কেবল তা মেনে চলাকে অস্বীকার করে ও মানুষদেরকে তা থেকে ফিরিয়ে রাখে৷ সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ তা’আলার হুকুম ও ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে এবং দুনিয়ার উপর আল্লাহ তা’আলার কর্তৃত্বকে অস্বীকার করবে, বাস্তবিকই সে ইবলীসের চেয়ে নিকৃষ্ট বলে পরিগণিত হবে৷
আল্লাহ তা’আলার ইবাতদের ক্ষেত্রে অহংকার প্রদর্শন করা ও আল্লাহ তা’আলার শরীয়তের সামনে মাথানত করাকে অস্বীকার করা– এই জায়গাগুলোতে ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসীরা ইবলীসের সাথে সাদৃশ্যতা রাখে৷ অতঃপর এর চেয়েও আগে বেড়ে ইবলীস যে জিনিসকে স্বীকার করে অর্থাৎ নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে আল্লাহ তা’আলার প্রভূত্ব ও শাসন ক্ষমতাকে মেনে নেয়া, সেটাকেও তারা(ধর্মনিরেপেক্ষতায় বিশ্বাসী) অস্বীকার করে৷
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ. বলেছেন, “যেই দাম্ভিক অহংকারী বাহ্যত ফেরআউনের মত আল্লাহ তা’আলাকে অস্বীকার করে, সে তাদের থেকে তথা আরবের মুশরিক ও সেই ইবলীস থেকেও বড় কাফের। অথচ ইবলীস নিজেই এধরনের কাজের নির্দেশ দেয়, এগুলোকে ভালবাসে এবং আল্লাহ তা’আলার ইবাদত ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে অহংকার প্রদর্শন করে৷ যদি সেই দাম্ভিক অহংকারী আল্লাহ তা’আলার অস্তিত্ব ও বড়ত্বের ব্যাপারে জ্ঞাত থাকে, যেমনিভাবে ফেরআউন আল্লাহ তা’আলার অস্তিত্বের ব্যাপারে জ্ঞাত ছিল, তবুও তার ব্যাপারে এমন সিদ্ধান্তই নেয়া হবে।” (মাজমুউল ফাতাওয়া: ৭/৬৩৩)
সুতরাং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা ইবাদতে অহংকার প্রদর্শন ও শরীয়তের সামনে মাথানত করতে অস্বীকার করার কুফুরীর ক্ষেত্রে ইবলীসের সাথে মিল রাখে৷ অতিরিক্তভাবে তারা ভূপৃষ্ঠে আল্লাহ তা’আলার শাসন ক্ষমতাকে অস্বীকার করার কুফুরীতেও লিপ্ত৷ এ কারণে তারা আরবের মুশরিক ও সে সকল ইয়াহুদী-খৃষ্টানদের চেয়েও নিকৃষ্ট, যারা বিভিন্ন ধরনের আদেশ-নিষেধ ও আশা-হুশিয়ারির বাণীকে স্বীকার করে৷ সুতরাং তারা সে সমস্ত মুবাহিয়্যাহ ও তার অনুরূপ দলগুলোর ন্যায়, যাদের ব্যাপারে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ. বলেছেন,
“তেমনিভাবে যে সকল মুবাহিয়্যারা আল্লাহ তা’আলার আদেশ-নিষেধকে পুরোপুরিভাবে বাদ দিয়ে দেয় এবং নিয়তি ও তাকদীরকে প্রমাণ স্বরূপ পেশ করে, তারা ইয়াহুদী-খৃষ্টান ও আরবের মুশরিকদের চেয়েও নিকৃষ্ট৷ কেননা ইয়াহুদী-খৃষ্টান ও আরবের মুশরিকরা তাদের কুফুরী সত্ত্বেও বিভিন্ন ধরনের আদেশ-নিষেধ ও আশা-হুঁশিয়ারি বাণীকে স্বীকার করে৷ তবে (সমস্যা হল,) তাদের এমন কিছু শরীক দেবতা ছিল, যার ইবাদাত করার অনুমতি আল্লাহ তা‘আলা দেননি৷
অন্যদিকে মুবাহিয়্যারা শরীয়তকে পুরোপুরিভাবে বাদ দিয়ে দেয়৷ কেননা তাদের মনে যা চায়, তারা কেবল সে জিনিসেই আনন্দিত ও ক্রোধান্বিত হয়৷ তারা আল্লাহর জন্য আনন্দিতও হয় না, ক্রোধান্বিতও হয় না। তারা আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসে না, ঘৃণাও করে না৷ আল্লাহ যে কাজের আদেশ দিয়েছেন তারা সে কাজের আদেশ দেয় না এবং আল্লাহ যে কাজ করতে নিষেধ করেছেন, তারা সে কাজ হতে মানুষদের বারণ করে না৷ তবে সে কাজটি যদি তাদের মনঃপূত হয়, তাহলে আপন রবের ইবাদত স্বরূপ নয় বরং কেবল আপন প্রবৃত্তির অনুসরণ বশত: তারা তা সম্পাদন করে৷ এ কারণেই ভূপৃষ্ঠে যত কুফুরী, ফুসুকী ও পাপাচার সংঘটিত হয়, তারা সেগুলোর বিরোধিতা করে না৷ তবে এগুলো যখন তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, তখনই কেবল তারা তার বিরোধিতা করে। আর এ বিরোধিতা তাদের মধ্যকার স্বভাবগত শয়তানীভাব থাকার দরুন করে থাকে। তাদের মধ্যকার রহমানীভাব বা শরীয়তের কারণে নয়৷” (মাজমুউল ফাতাওয়া: ৮/৪৫৭-৪৫৮)
এর দ্বারা বুঝা গেল, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা’আলার রবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাতকে স্বীকার করে ও বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তা’আলা হুকুম প্রদান করার ও বিধান প্রণয়ন করার অধিকার রাখেন এবং এ সকল বিষয়ে নিজেকে সে তাঁর সামনে সপে দেয়, সে ব্যক্তি যদি এগুলোর কোন কোন অংশে বা সর্বাংশেও অন্য কাউকে আল্লাহ তা’আলার সহিত শরিক করে তবুও সে ঐ ব্যক্তির তুলনায় কম পথভ্রষ্ট, যে এসব কিছু থেকে আল্লাহ তা’আলাকে আলাদা করে দিয়ে দাবি জানায় যে, আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর দ্বীনের জন্যে উচিত নয় মানবজীবন, শাসনকার্য বা রাজনীতিতে নাক গলানো!!
সুতরাং ইয়াহুদী, খৃষ্টান, কবরপূজারী, মুশরিক ও কাফেরদের অনেকেই তাদের কুফুরীর ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের চেয়ে নিম্নতর৷
দ্বিতীয় কারণঃ
এ কথা সর্বজন বিদিত যে, শিরক, কুফর কিংবা রিদ্দাহর সাথে যখন যুদ্ধ ও আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার মত বিষয় এসে যুক্ত হয়, তখন তা অন্যান্য সাধারণ কুফুরী ও রিদ্দাহর চেয়ে আরো গুরুতর অন্যায় ও বড় কুফুরীতে রূপ নেয়৷
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ. বলেছেন, “রিদ্দাহ দু’প্রকার: সাধারণ রিদ্দাহ ও এমন কঠিন রিদ্দাহ, যার ব্যাপারে হত্যার বিধান রয়েছে৷ উভয় প্রকারের রিদ্দাহ’তে প্রবিষ্ট মুরতাদকেই হত্যা করা ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে দলিল রয়েছে৷ যে দলিলের ভিত্তিতে তাওবার কারণে হত্যা মাফ হয়ে যায়, তা উভয় প্রকারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়৷ বরং তা প্রথম প্রকার তথা সাধারণ রিদ্দাহর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য৷ যা মুরতাদের তাওবা কবুল হওয়ার দলিলগুলো নিয়ে চিন্তা করার দ্বারা বুঝে আসে৷
বাকি রইল দ্বিতীয় প্রকার তথা কঠিন রিদ্দাহ৷ এ প্রকারের রিদ্দাহ’তে প্রবিষ্ট মুরতাদকে হত্যা করা ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে দলিল থাকার পাশাপাশি তার হত্যা মাফ হওয়ার ব্যাপারে কোন নস ও ইজমা পাওয়া যায় না৷ আর উভয় প্রকারের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য থাকার কারণে কিয়াসও অসম্ভব৷ তাই সঙ্গত কারণেই দ্বিতীয় প্রকারকে প্রথম প্রকারের সাথে জুড়ে দেয়ার কোন অবকাশ নেই৷ যে জিনিসটি এই বিষয়টিকে নিশ্চিত করে তা হচ্ছে — যে কেউই কোন কথা বা কাজের মাধ্যমে মুরতাদ হয়ে যাবে, সে যদি গ্রেফতার হওয়ার পর তাওবা করে নেয়, তাহলে তার হত্যা মাফ হয়ে যাবে এমনটা কোরআন, হাদিস ও ইজমার কোথাও উল্লেখ নেই। বরং কুরআন, হাদিস ও ইজমা মুরতাদদের প্রকারসমূহের মধ্যকার পার্থক্য বর্ণনা করে দিয়েছে৷” (আছ-ছারিমুল মাসলূল: ৩/৬৯৬)
যে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী দ্বীনকে মানবজীবন থেকে পৃথক করে দেয়, দ্বীনকে বিচারব্যবস্থা ও আইন প্রণয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং দ্বীনকে রাজনীতি, রাষ্ট্র ও দুনিয়া থেকে আলাদা করে দেয়, সে ইসলামের সাথে সম্পৃক্ততার দাবি করলেও সে কঠিনতর রিদ্দাহে লিপ্ত রয়েছে৷ মুশরিক ও কাফেরদের অনেকেই এই ধরমনিরেপেক্ষতাবাদীদের থেকে উত্তম। এক শ্রেণীর মুরতাদ রয়েছে এমন, যাদের মাঝে ঈমান ভঙ্গের কারণসমূহের মধ্য থেকে কোন একটি পাওয়া যাওয়ার কারণে সে কাফের হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এই শ্রেণীর মুরতাদরা ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদাকরণের দিকে মানুষদের আহবান জানায় না। কিংবা মানুষদের মাঝে এই মতবাদ ছড়িয়ে দেয়া, তাদের হৃদয়ে তা স্থির করে দেয়ার চেষ্টাও করে না। এই শ্রেণীর মুরতাদরা ধর্মনিরেপক্ষতার দিকে আহবানকারীদের চাইতে উত্তম।
তৃতীয় কারণঃ
এতে কোন সন্দেহ নেই যে, শিরক হচ্ছে সবচেয়ে বড় গুনাহ৷ যেমন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ سَأَلْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَيُّ الذَّنْبِ أَعْظَمُ عِنْدَ اللَّهِ قَالَ أَنْ تَجْعَلَ لِلَّهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ.
‘‘আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম যে, কোন্ গুনাহ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড়? তিনি বললেন, আল্লাহ্র জন্য অংশীদার সাব্যস্ত করা। অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন৷…” (বুখারী, মুসলিম)
কিন্তু এ হাদিসটি হল ব্যাপক, যেটিকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে এ আয়াতের মাধ্যমে-
قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَن تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَن تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ ﴿الأعراف: ٣٣﴾
“আপনি বলে দিনঃ আমার পালনকর্তা কেবলমাত্র অশ্লীল বিষয়সমূহ হারাম করেছেন যা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য এবং হারাম করেছেন গোনাহ, অন্যায়-অত্যাচার আল্লাহর সাথে এমন বস্তুকে অংশীদার করা, তিনি যার কোন, সনদ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর প্রতি এমন কথা আরোপ করা, যা তোমরা জান না।” (সূরা আরাফ: ৩৩)
আল্লাহ তা’আলা উপরের উল্লেখিত আয়াতে গুনাহগুলোকে ছোট থেকে বড় আকারে বিন্যস্ত করেছেন। এখানে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা সবচেয়ে বড় গুনাহ সাব্যস্ত করেছেন “না জেনে আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের প্রতি কোন কথা আরোপ করা”কে৷ সুতরাং এ আয়াতে আপনি দেখছেন যে, না জেনে আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের প্রতি কোন কথা আরোপ করা আল্লাহর সঙ্গে শিরক করার চেয়েও বড় গুনাহ৷ আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. কে যেই উত্তর দিয়েছিলেন, সেটা ছিল এ প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে যে, তাদের যমানার মুশরিকদের মাঝে প্রচলিত গুনাহসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটি? অর্থাৎ সর্বকালের হিসেবে নয় বরং সেই যুগে তাঁর উম্মতের জন্য সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও বিপজ্জনক গুনাহ কোনটি।
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেছেন, “ফতোয়া ও বিচার-ফয়সালায় না জেনে আল্লাহর প্রতি কোন কথা আরোপ করাকে আল্লাহ তা’আলা হারাম করেছেন ও এটিকে সবচেয়ে বড় গুনাহসমূহের একটি বলে গণ্য করেছেন৷ উপরন্তু এ কাজটিকে তিনি সবচেয়ে বড় গুনাহসমূহের মাঝে সর্বোচ্চ পর্যায়ের বলে আখ্যা দিয়ে বলেছেন,
قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَن تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَن تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ ﴿الأعراف: ٣٣﴾
“আপনি বলে দিন, আমার পালনকর্তা কেবলমাত্র অশ্লীল বিষয়সমূহ হারাম করেছেন যা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য এবং হারাম করেছেন গুনাহ ও অন্যায়-অত্যাচার করা, আল্লাহর সাথে এমন বস্তুকে অংশীদার করা, তিনি যার কোন সনদ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর প্রতি এমন কথা আরোপ করা, যা তোমরা জান না৷” (সূরা আরাফ: ৩৩)
সুতরাং এখানে তিনি হারাম কাজগুলোকে চারটি স্তরে ধারাবাহিকভাবে সাজিয়েছেন-
-প্রথমে তিনি এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে হালকাটির মাধ্যমে শুরু করেছেন৷ আর তা হচ্ছে, অশ্লীল বিষয়সমূহ৷
-অতঃপর দ্বিতীয়তে তিনি ঐ গুনাহের কথা উল্লেখ করেছেন, যা প্রথমটির চেয়ে অধিকতর হারাম৷ আর তা হচ্ছে, পাপ ও অন্যায়-অত্যাচার করা৷
-অতঃপর তৃতীয়তে তিনি ঐ গুনাহের কথা উল্লেখ করেছেন, যা আগের গুলোর চেয়ে গুরুতর হারাম৷ আর তা হচ্ছে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সাথে শিরক করা৷
-অতঃপর চতুর্থতে তিনি ঐ গুনাহের কথা উল্লেখ করেছেন, যা আগের সবগুলোর চেয়ে তীব্রতর হারাম৷ আর তা হচ্ছে, না জেনে আল্লাহর ব্যাপারে কোন কথা আরোপ করা৷ আর এই না জেনে আল্লাহর প্রতি কোন কথা আরোপ করাটা তাঁর পবিত্র নাম, গুনাবলী ও কার্যাদির ব্যাপারেও হতে পারে এবং তাঁর প্রদত্ত দ্বীন ও শরীয়তের ব্যাপারেও হতে পারে৷” (ই’লামুল মুওয়াক্কিয়ীন)
ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি, তাঁর গুনাবলী ও কার্যাদির প্রতি এবং তাঁর দ্বীন ও শরীয়তের প্রতি দুঃসাহস দেখিয়ে থাকে৷ এগুলোকে সে অকেজো করে দেয়, বিচারকার্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং পৃথিবীর নিয়ম-নীতে থেকে এগুলোকে আলাদা করে দেয়৷ এর দ্বারা সে মুশরিকের চেয়েও নিকৃষ্ট ও অধিক পথভ্রষ্ট প্রমাণিত হয়৷
না জেনে আল্লাহর ব্যাপারে কোন কথা আরোপ করা শিরকেরও অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়৷ সেক্ষেত্রে তা হবে শিরকের সবচেয়ে মারাত্মক ও ভয়ঙ্কর স্তর৷ এ কাজটি শিরকের অন্তর্ভুক্ত হয় এভাবে যে, একজন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী নিজের প্রবৃত্তির পূজা করে থাকে৷ যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন,
أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَٰهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَىٰ عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَىٰ سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَىٰ بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَن يَهْدِيهِ مِن بَعْدِ اللَّهِ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ ﴿الجاثية: ٢٣﴾
“আপনি কি তার প্রতি লক্ষ্য করেছেন, যে তার খেয়াল-খুশীকে স্বীয় উপাস্য স্থির করেছে? আল্লাহ জেনে শুনে তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, তার কান ও অন্তরে মোহর এঁটে দিয়েছন এবং তার চোখের উপর রেখেছেন পর্দা৷ অতএব আল্লাহর পর কে তাকে পথ প্রদর্শন করবে? তোমরা কি চিন্তাভাবনা কর না?” (সূরা জাসিয়া: ২৩)
সুতরাং ইতিপূর্বে প্রথমোক্ত আয়াতে যে বিন্যাসের উল্লেখ রয়েছে, তা কোন বিষয়ের গুরুত্ব বুঝানোর জন্য ও তার ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলার জন্য ব্যাকরণগত দিক থেকে ব্যাপকভাবে কোন বিষয়কে উল্লেখ করার পর বিশেষভাবে সে বিষয়টাকে পুনরায় উল্লেখ করার আওতায় পরবে৷ তবে এর দ্বারা অর্থের মাঝে বৈপরীত্যতা বজায় থাকবে৷
চতুর্থ কারণঃ
এ কথা সর্বজন বিদিত যে, ভ্রষ্টতার দিকে আহ্বানকারী ও বিভ্রান্তি বিস্তারকারী নেতারা তাদের অধীনস্থ পথভ্রষ্ট ব্যক্তিদের তুলনায় বেশী নিকৃষ্ট ও অধিকতর অপরাধী৷ তাই ফেরআউন ও হামান, তাদের অনুসারী ও পূজারীদের তুলনায় বেশী নিকৃষ্ট৷ যদিও উভয় শ্রেণীই কাফের৷ কিন্তু কুফুরীর বিভিন্ন স্তর রয়েছে৷ সবাই এক ধরনের নয়৷
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করে দিয়েছেন যে, সমস্ত উম্মাহর মাঝে বিদ্যমান বিভ্রান্তি এ দুই অপরাধের কোন একটি হয়ে থাকে:
-প্রথম অপরাধটি হচ্ছে, গাইরুল্লাহর ইবাদত করা৷
-আর দ্বিতীয় অপরাধটি হচ্ছে, আল্লাহ যা হালাল করেছেন, সেটাকে হারাম করা; কিংবা তিনি যা হারাম করেছেন, সেটাকে হালাল করা; অথবা তিনি যার অনুমতি দেননি, এমন বিধান প্রবর্তন করার মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করা৷
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, দ্বিতীয়টি অধিক নিকৃষ্ট৷ মুশরিক সাধারণত গাইরুল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে অন্য কারো অনুসারী হয়ে থাকে৷ আর মিথ্যারোপকারী অথবা আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে মানুষের বিধান প্রবর্তনকারীরা দুনিয়ার বুকে মানুষকে ভ্রষ্টতার দিকে আহ্বানকারী। এ বিষয়টিই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত হয়েছে৷ যেখানে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন-
وإني خلقت عبادي حنفاء كلهم، وإنهم أتتهم الشياطين فاجتالتهم عن دينهم، حرمت عليهم ما أحللت لهم، وأمرتهم أن يشركوا بي ما لم أنزل به سلطانا
“আমি আমার সকল বান্দাদেরকে একনিষ্ঠ করে সৃষ্টি করেছি৷ তারপর তাদের নিকট শয়তানেরা এসে তাদেরকে তাদের দ্বীন থেকে ঘুরিয়ে দিয়েছে ও আমি তাদের জন্য যা হালাল করেছি, সেগুলোকে তারা হারাম করে দিয়েছে এবং তাদেরকে আমার সাথে এমন কাউকে শরিক করতে নির্দেশ দিয়েছে, যার সম্পর্কে আমি কোন সনদ অবতীর্ণ করিনি৷”(সহীহ মুসলিম)
এ হাদিস একত্ববাদ থেকে সরে যাওয়া ব্যক্তিদেরকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে- ‘মুশরিক অনুসারী’ ও ‘বিধান প্রবর্তক’৷ আর এই বিধান প্রবর্তকেরা হচ্ছে, মানব ও জ্বীন শয়তান৷ সুতরাং কাফের প্রধান ও ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারীরা তাদের অধীনস্থ যাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে, তাদের তুলনায় তারা নিকৃষ্ট ও গুরুতর কাফের৷
কোন কাফের যখন ভ্রষ্টতার প্রচারক ও বিভ্রান্তির প্রধান হয়, তখন সকল উলামা, উকালা/জ্ঞানীরা ও ফুকাহারাই অন্যান্য কাফেরদের তুলনায় সেই কাফেরকে আলাদাভাবে গণ্য করেছেন৷ কেননা সাধারণ পথভ্রষ্ট অনুসারী ও সে সমান নয়৷ বরং সাধারণ পথভ্রষ্ট অনুসারীদের চেয়ে সে ঢের বড় পাপী ও জঘণ্য কাফের৷ এ কারণেই যারা আল্লাহর পথে বাধা দেয় ও মানুষদেরকে বিভ্রান্ত করে, তাদের জন্য দ্বিগুন শাস্তির ধমকি এসেছে। আল্লাহ তা’আলা বলেছেন যে, যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে তাদের চেয়ে বড় জালেম আর কেউ হতে পারে না৷ এরা আল্লাহর পথে মানুষদেরকে বাধা দিত ও তাতে বক্রতা খুঁজে বেড়াত৷ আর এ সবই হচ্ছে বিভ্রান্তির প্রধান ও অনুসৃত ব্যক্তিদের গুনাবলী৷ তাই আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, يضاعف لهم العذاب “তাদের জন্য দ্বিগুণ শাস্তি রয়েছে” এবং তাদেরকে الأخسرون (সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত) বলে গুনান্বিত করেছেন৷ আর এটা হচ্ছে সেই الخاسرون (ক্ষতিগ্রস্ত) এর অগ্রাধিকার সূচক বিশেষণ, যার দ্বারা কুরআনের জায়গায় জায়গায় সাধারণ পথভ্রষ্টদেরকে গুনান্বিত করা হয়েছে৷ এবার আপনি আল্লাহ তা’আলার আয়াতটি দেখুন-
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَىٰ عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أُولَٰئِكَ يُعْرَضُونَ عَلَىٰ رَبِّهِمْ وَيَقُولُ الْأَشْهَادُ هَٰؤُلَاءِ الَّذِينَ كَذَبُوا عَلَىٰ رَبِّهِمْ أَلَا لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ ﴿هود: ١٨﴾ الَّذِينَ يَصُدُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ وَيَبْغُونَهَا عِوَجًا وَهُم بِالْآخِرَةِ هُمْ كَافِرُونَ ﴿هود: ١٩﴾ أُولَٰئِكَ لَمْ يَكُونُوا مُعْجِزِينَ فِي الْأَرْضِ وَمَا كَانَ لَهُم مِّن دُونِ اللَّهِ مِنْ أَوْلِيَاءَ يُضَاعَفُ لَهُمُ الْعَذَابُ مَا كَانُوا يَسْتَطِيعُونَ السَّمْعَ وَمَا كَانُوا يُبْصِرُونَ ﴿هود: ٢٠﴾ أُولَٰئِكَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنفُسَهُمْ وَضَلَّ عَنْهُم مَّا كَانُوا يَفْتَرُونَ ﴿هود: ٢١﴾ لَا جَرَمَ أَنَّهُمْ فِي الْآخِرَةِ هُمُ الْأَخْسَرُونَ ﴿هود: ٢٢﴾
“আর তাদের চেয়ে বড় জালেম কে হতে পারে, যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে৷ এসব লোককে তাদের পালনকর্তার সাক্ষাতের সম্মুখীন করা হবে আর সাক্ষীগণ বলতে থাকবে, এরাই ঐসব লোক, যারা তাদের পালনকর্তার প্রতি মিথ্যারোপ করেছিল৷ শুনে রাখ, যালেমদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত রয়েছে৷ যারা আল্লাহর পথে বাধা দেয়, আর তাতে বক্রতা খুজে বেড়ায়, এরাই আখেরাতকে অস্বীকার করে৷ তারা পৃথিবীতেও আল্লাহকে অপারগ করতে পারবে না এবং আল্লাহ ব্যতীত তাদের কোন সাহায্যকারীও নেই, তাদের জন্য দ্বিগুণ শাস্তি রয়েছে; তারা শুনতে পারতো না এবং দেখতেও পেত না৷ এরা সে সমস্ত লোক, যারা নিজেরাই নিজেদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, আর এরা যা কিছু মিথ্যা মা’বুদ সাব্যস্ত করেছিল, তা সবই তাদের থেকে হারিয়ে গেছে৷ আখেরাতে এরাই হবে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত কোন সন্দেহ নেই৷” সূরা হুদ: ১৮-২২)
এতে কোন সন্দেহ নেই যে, গোটা মানবজীবনের সঙ্গে বা মানবজীবনের কতক অংশ, যেমন রাজনীতি কিংবা বিচারকার্যের সঙ্গে আল্লাহর দ্বীন ও শরীয়তের কোন সম্পর্ক নেই বলে দাবি করা- আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের প্রতি মিথ্যারোপ করা এবং তাঁর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার নামান্তর৷ এমন দাবি যারা করে, তারাই হচ্ছে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত ও অন্যান্য সাধারণ মুশরিকদের তুলনায় গুরুতর কাফের৷ এমন দাবি জানিয়ে মানুষদের বিভ্রান্ত করা মূলত: দ্বীনের পথে এক ধরনের বাধা প্রদান৷ তাদের এই বিভ্রান্তি সাধারণ মুশরিকদের বিভ্রান্তির চেয়েও মারাত্মক৷ কেননা মুশরিকদের কতক সকল বিধানকেই স্বীকার করে, কেউ কেউ কতিপয় বিধানকে, কতক আবার অধিকাংশ বিধানকেই স্বীকৃতি দিয়ে থাকে৷ তাদের কেউ কেউ সকল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্যতা অর্জন করার চেষ্টা করে, কেউ আবার আংশিক ইবাদতের মাধ্যমে৷ কিন্তু তারা কোন না কোন ভাবে আল্লাহর সাথে একজন শরিক স্থাপন করে৷ আল্লাহর সাথে তারা যার ইবাদত করে থাকে, তারা ধারণা করে থাকে যে, হাশরের মাঠে সে আল্লাহর সামনে তার জন্য সুপারিশ করবে৷ এইভাবে মুশরিকরা যোগসাজশ করে আল্লাহর ইবাদত করে ও অন্যান্য ইলাহদের প্রতি ভক্তি করে৷ কিন্তু তারা তাদের দ্বীন ও দুনিয়ার প্রতি আল্লাহর কর্তৃত্বকে বাতিল করে দেয় না, যেননটি করে থাকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা৷
আজকের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ যে বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করতে চায় সেটি হচ্ছে, “পার্থিব বিষয়াবলীতে ধর্মের কোন কর্তৃত্ব নেই”। বাক্যটির প্রকৃত উদ্দেশ্য হল: নিম্নের আয়াতটিকে কর্তন করে দেয়া, যেখানে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-
وَهُوَ الَّذِي فِي السَّمَاءِ إِلَٰهٌ وَفِي الْأَرْضِ إِلَٰهٌ وَهُوَ الْحَكِيمُ الْعَلِيمُ ﴿الزخرف: ٨٤﴾
“তিনিই উপাস্য নভোমণ্ডলে এবং তিনিই উপাস্য ভূমণ্ডলে৷ তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ৷” (সূরা যুখরুফ: ৮৪)
অথবা আয়াতটিকে সংক্ষিপ্ত করে দেয়া ও এই ফ্রেমে এঁটে দেয়া যে, তিনি শুধুমাত্র নভোমণ্ডলে ইলাহ৷ আর ভূমণ্ডলের সাথে তাঁর কোন সম্পৃক্ততা নেই৷
সুতরাং ধর্মনিরপেক্ষতার বাস্তবতা হল, ভূপৃষ্ঠে আল্লাহ তা’আলার শাসন ক্ষমতাকে বাতিল করে দেয়া, বান্দাদের মধ্যকার বিচারকার্য থেকে ধর্মকে দূরে সরিয়ে রাখা এবং রাজনীতি থেকে ধর্মকে অপসারণ করে দেয়া৷ আর সন্দেহাতীতভাবেই বলা যায় যে, এই শ্রেণীর লোকেরা ঐ সমস্ত লোকদের চেয়েও বড় পাপী, যারা ভূপৃষ্ঠে আল্লাহ তা’আলার ইবাদতে শরীক স্থাপন করে, কিন্তু আল্লাহ বিধানদাতা ও শাসন ক্ষমতার অধিকারী হওয়াকে অস্বীকার করে না।
সুতরাং কুফুরীর বিভিন্ন স্তর রয়েছে ও ধর্মনিরপেক্ষতা নামক কুফুরীর স্তর অন্যান্য কুফুরীর তুলনায় অধিক নিকৃষ্ট ও তীব্রতর৷ কেননা ধর্মনিরপেক্ষতা আল্লাহ তা’আলার প্রতি, তাঁর দ্বীন-শরীয়তের প্রতি মিথ্যারোপ করে থাকে। তাঁকে দুনিয়া থেকে অপসারণ করে দেয় এবং তাঁর থেকে তাঁর শাসন ক্ষমতাকে ছিনিয়ে নিয়ে পুরোটাই এককভাবে সাব্যস্ত করে দেয় বান্দাদের জন্য৷
এ কারণে এখানে এই উত্তরের সাথে অতিরিক্ত আরো কিছু কথা সংযোজন করা যেতে পারে৷ যা প্রশ্নকারী যতটুকু জানতে চেয়েছে তাকে তারচেয়ে বেশী কিছু দেয়ার পর্যায়ে পড়বে৷
-প্রথম অংশঃ যে সকল শাসকরা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান ছাড়া অন্য আইন দ্বারা বিচার-ফয়সালা করে, তাদের মাঝে তুলনা করা৷ সন্দেহাতীতভাবে কুফুরীর স্তরের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে পার্থক্য থাকবে। তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি শরীয়তের সকল আহকাম বাতিল করে দিবে, সে ঐ ব্যক্তির তুলনায় অধিক নিকৃষ্ট, যে শরীয়তের কিছু দণ্ডবিধি অবশিষ্ট রাখবে৷ যে ব্যক্তি শরীয়তের মধ্যকার পারিবারিক আইন (বিবাহ, তালাক ও উত্তরাধিকার সম্পর্কিত বিধান)সহ গোটা শরীয়তকেই অপসারণ করবে, সে ঐ ব্যক্তির তুলনায় নিকৃষ্ট ও ঘৃণ্যতর, যে শরীয়তকে উপযুক্ত মনে করে পারিবারিক আইনকে শরীয়ত অনুযায়ীই রাখবে৷ যে ব্যক্তি তার সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে এবং শরীয়তকে আইন প্রণয়নের উৎসসমূহের মধ্য থেকে একটি উৎস হিসেবে নির্ধারণ করাকে বাতিল করে দিবে, সে ঐ ব্যক্তির তুলনায় নিকৃষ্ট ও ঘৃণ্যতর কাফের, যে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে এবং শরীয়তকে আইন প্রণয়নের উৎসসমূহের মধ্য থেকে একটি উৎস হিসেবে বহাল রাখার উপর সংকল্প করবে৷ তথাপি সে শিরক ও কুফর থেকে মুক্ত হতে পারবে না, যে বিষয়টি আমি আমার উপরোক্ত লেখায় উল্লেখ করেছি৷
-যে ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদকে গ্রহণ করার পরিবর্তে তার থেকে দায়মুক্তি ঘোষণা করে ও তার সংবিধান ইসলাম এবং সে আল্লাহর শরীয়ত ছাড়া অন্য কোন বিধান দ্বারা বিচার-ফয়সালা করে না বলে দাবি জানায়; সে ব্যক্তি তার চাইতে উত্তম যে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলে, সে ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদকে গ্রহণ করেছে। যদিও প্রথমোক্ত ব্যক্তির যে বিষয়গুলো তার ঈমান নষ্ট করে দিয়ে, তাকে কাফের বানিয়ে দিয়েছে ও বর্তমানে আমাদের কাছে তার হুকুম কী সেদিকে তার কোন ভ্রুক্ষেপই নেই, তবুও সে দ্বিতীয় ব্যক্তি অপেক্ষা উত্তম।
দ্বিতীয় অংশঃ স্বয়ং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরাও বিভিন্ন শ্রেণীর রয়েছে৷ এদের কুফুরীর স্তরের ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে৷ তাদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও জঘণ্যতর হচ্ছে তারা, যারা ফেরআউনের মত দ্বীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। এই শ্রেণী দ্বীনকে পুরোপুরি অস্বীকার করে, লোকদেরকে দ্বীন মানতে বাধার সৃষ্টি করে, দ্বীনের বিধানাবলীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করে এবং নিজেদের ধর্ম ত্যাগের কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করে বেড়ায়৷
তাদের আরেক শ্রেণী রয়েছে, যারা এদের চেয়ে কম নিকৃষ্টতর৷ তারা দ্বীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ও দ্বীনের পথে বাধা সৃষ্টি করার প্রতি তেমন আগ্রহী না৷ কিন্তু দুনিয়া, বিচারকার্য ও রাজনীতির বিষয়াবলীতে শরীয়তের হস্তক্ষেপকে তারাও বাধাগ্রস্ত করে৷
তাদের তৃতীয় আরেক শ্রেণী রয়েছে, যাদেরকে ‘এরদোগানী’ বলে নাম রাখা যেতে পারে৷ এই এরদোগানী ধর্মনিরপেক্ষতার বিশেষ সংজ্ঞা রয়েছে৷ তারা শরীয়তকে মুখে স্বীকার করে এবং কখনো কখনো ব্যক্তিগতভাবে চালচলনেও স্বীকার করে৷ কিন্তু বিচারকার্য ও শাসনব্যবস্থায় শরীয়তকে তারা অদৃশ্য করে ফেলে৷ তারা সকল ধর্ম ও ধর্মানুসারীদেরকে সমান চোখে দেখে৷ তাই তাদের কারো সাথেই তারা সম্পর্ক ছিন্ন করে না ও ইসলামকে তারা কোন বাড়তি শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করে না কিংবা অন্যান্য ধর্মের উপরে স্থান দেয় না৷ এমনিভাবে তারা বিচারকার্য থেকেও ইসলামকে অপসারণ করে দিয়েছে৷ এই এরদোগানী ধর্মনিরপেক্ষতার চেয়েও অধিকতর বিপথগামী ও বক্রতাপূর্ণ হচ্ছে, ঘানুশী ধর্মনিরপেক্ষতা৷
এই আলোচনার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, এটা উম্মাহকে জানানো যে, স্বয়ং ধর্মনিরপেক্ষতাও বিভিন্ন স্তরের রয়েছে৷ এর বিভিন্ন শ্রেণী কুফুরের বিভিন্ন স্তরের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং আতাতুর্কী ধর্মনিরপেক্ষতা কখনোই এরদোগানী ধর্মনিরপেক্ষতার সমপর্যায়ের হতে পারে না৷ যদিওবা এরদোগানী ধর্মনিরপেক্ষতা আতাতুর্কী ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে দায়মুক্তি ঘোষণা করে না ও সেটাকে অস্বীকার করে না; বরঞ্চ সেটার অনুসরণ করে থাকে, সেটাকে স্বাগত জানিয়ে থাকে ও সেটার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে থাকে!
وصلى الله وسلم على نبينا محمد وعلى آله وأصحابه أجمعين.
উত্তর প্রদানে-
শাইখ আবু মুহাম্মাদ আল-মাকদিসী হাফিজাহুল্লাহ